জন্মভূমি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে।
সার্থক জনম, মা গো, তোমায় ভালোবেসে॥
জানি নে তোর ধন রতন আছে কি না রানির মতন,
শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে ॥
কোন্ বনেতে জানি নে ফুল গন্ধে এমন করে আকুল,
কোন্ গগনে ওঠে রে চাঁদ এমন হাসি হেসে ॥
আঁখি মেলে তোমার আলো প্রথম আমার চোখ জুড়ালো,
ওই আলোতে নয়ন রেখে মুদব নয়ন শেষে ॥
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
'এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না'কো তুমি, সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি।'
সার্থক - সফল।
জনম - জন্ম শব্দটির 'ন্ম' যুক্তাক্ষর ভেঙে 'ন'ও 'ম' আলাদা করা হয়েছে । এর আরও দৃষ্টান্ত আছে। যেমন, 'রত্ন' থেকে রতন, 'যত্ন' থেকে যতন।
আকুল - উৎসুক। ব্যগ্র। অধীর।
মুদব - বুজব। বন্ধ করব।
এই গীতবাণীতে জন্মভূমির প্রতি কবির মমত্ববোধ ও গভীর দেশপ্রেম ফুটে উঠেছে।
জন্মভূমিকে ভালোবাসতে পেরেই কবি তাঁর জীবনের সার্থকতা অনুভব করেন। কবির জন্মভূমি অজস্র ধনরত্নের আকর কি না, তাতে তাঁর কিছু আসে যায় না। কারণ, তিনি এই মাতৃভূমির স্নেহছায়ায় যে সুখ ও শান্তি লাভ করেছেন তা অতুলনীয়। জন্মভূমির অপরূপ সৌন্দর্যের ঐশ্বর্যে কবি মুগ্ধ। জন্মভূমির বিচিত্র সৌন্দর্যের অফুরন্ত উৎস হচ্ছে বাগানের ফুল, চাঁদের জ্যোৎস্না, সূর্যের আলো। এসব কবির মনকে আকুল করে।
মাতৃভূমির সূর্যালোকে কবির চোখ পরিপূর্ণভাবে জুড়িয়েছে। তাই কবির একান্ত ইচ্ছা জন্মভূমির মাটিতেই যেন তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার সুযোগ পান।
এশীয়দের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম নোবেল-বিজয়ী কবি। 'গীতাঞ্জলি' নামের ইংরেজি কবিতার সংকলনের জন্য ১৯১৩ সালে তিনি এই পুরস্কার লাভ করেন। কেবল কবিতা নয়, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, গান- বাংলা সাহিত্যের সকল শাখাই তাঁর একক অবদানে ঐশ্বর্যমণ্ডিত।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই মে (১২৬৮ বঙ্গাব্দের পঁচিশে বৈশাখ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। স্কুলে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর হয় নি। সতের বছর বয়সে বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়েছিলেন। সে পড়াও শেষ না হতেই দেশে ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু স্বশিক্ষা ও সাধনায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এনে দেন অতুলনীয় সমৃদ্ধি। তিনি একাধারে সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ, সুরকার, গীতিকার, নাট্যকার, নাট্য-নির্দেশক, অভিনেতা এবং চিত্রশিল্পী। বিশ্বভারতী ও শান্তিনিকেতনের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তিনি শিক্ষায় নতুন ধারা সৃষ্টি করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে- 'সোনার তরী', 'গীতাঞ্জলি', 'বলাকা' ইত্যাদি কাব্য; 'ঘরে বাইরে', 'গোরা', 'যোগাযোগ', 'শেষের কবিতা' ইত্যাদি উপন্যাস; গল্পসংকলন 'গল্পগুচ্ছ'; 'বিসর্জন', 'রাজা', 'ডাকঘর', 'রক্তকরবী' ইত্যাদি নাটক। তিনি ছোটদের জন্য লিখেছেন 'শিশু ভোলানাথ', 'খাপছাড়া' ইত্যাদি। তাঁর রচিত 'আমার সোনার বাংলা' গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়েছে।
১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই আগস্ট (১৩৪৮ বঙ্গাব্দের বাইশে শ্রাবণ) কলকাতায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
১. দেশপ্রেমমূলক ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ রচনা করে একটি দেয়াল পত্রিকা তৈরি কর (শ্রেণির সকল শিক্ষার্থীর কাজ)।
২. বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকের দেশপ্রেমমূলক ছড়া, কবিতা, গল্প ও গান নির্বাচন করে একটি দেয়াল পত্রিকা তৈরি কর (শ্রেণির সকল শিক্ষার্থীর কাজ)।
সুখ
কামিনী রায়
নাই কিরে সুখ? নাই কিরে সুখ?-
এ ধরা কি শুধু বিষাদময়?
যাতনে জ্বলিয়া কাঁদিয়া মরিতে
কেবলি কি নর জনম লয়?-
বল ছিন্ন বীণে, বল উচ্চৈঃস্বরে-
না, না, না, মানবের তরে
আছে উচ্চ লক্ষ্য, সুখ উচ্চতর
না সৃজিলা বিধি কাঁদাতে নরে।
কার্যক্ষেত্র ঐ প্রশস্ত পড়িয়া
সমর-অঙ্গন সংসার এই,
যাও বীরবেশে কর গিয়া রণ;
যে জিনিবে সুখ লভিবে সে-ই।
পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মতো সুখ কোথাও কি আছে?
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
পরের কারণে মরণেও সুখ;
'সুখ' 'সুখ' করি কেঁদ না আর,
যতই কাঁদিবে, যতই ভাবিবে
ততই বাড়িবে হৃদয় ভার।
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবনী 'পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা,
প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
শিমুল ও জিহাদ দুই বন্ধু। শিমুল বিদেশে গিয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন 'করে বাড়ি-গাড়ি' করেছে। অন্যদিকে জিহাদ উপার্জন করে নিজের সংসার চালানোর পাশাপাশি অশিক্ষিত বয়স্ক লোকদের জন্য একটি নৈশ পাঠশালা খুলেছে।
বিষাদময় - দুঃখময়।
ছিন্ন - ছেঁড়া।
বীণে - বাদ্যযন্ত্র বিশেষের মাধ্যমে।
উচ্চৈঃস্বরে - চড়া গলায়। বলিষ্ঠ কণ্ঠে।
সৃজিলা - সৃষ্টি করলেন।
বিধি - বিধাতা। প্রভু।
নরে - মানুষকে।
সমর - সযুদ্ধ। লড়াই। রণ।
কার্যক্ষেত্র - কাজের জায়গা।
প্রশস্ত - প্রসারিত।
অঙ্গন - আঙিনা। উঠান। প্রাঙ্গণ।
জিনিবে - জয় করবে
লভিবে - লাভ করবে।
পরের কারণে - অন্যের জন্য।
স্বার্থ - নিজের সুবিধা। ব্যক্তিগত লাভ।
আপনার - নিজের।
বলি - উৎসর্গ। ত্যাগ। বিসর্জন।
হৃদয়ভার - মনের কষ্ট।
বিব্রত - ব্যতিব্যস্ত। দিশেহারা। বিপন্ন।
অবনী - পৃথিবী। ধরা। জগৎ।
আমরা সবাই জীবনে সুখী হতে চাই। কিন্তু কীভাবে জীবনে সুখ আসতে পারে, 'সুখ' কবিতায় কবি সে সম্পর্কে তাঁর ধারণা তুলে ধরেছেন।
জগতে যারা কেবল সুখ খোঁজেন তারা জীবনে দুঃখ-যন্ত্রণা দেখে ভাবেন মানুষের জীবন নিরর্থক। এ ধারণা ভুল। জীবনের উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য আরও বিস্তৃত, অনেক মহৎ। দুঃখ-যন্ত্রণা সয়ে, সকল সংকট মোকাবিলা করে জীবনসংগ্রামে সফলতার মাধ্যমেই সুখ অর্জিত হয়।
কিন্তু সমাজের অন্য সবার কথা ভুলে কেউ যদি কেবল নিজের স্বার্থ দেখে, সে হয়ে পড়ে আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। আর সমাজ-বিচ্ছিন্ন মানুষ প্রকৃত সুখ লাভ করতে পারে না।
পক্ষান্তরে অন্যকে আপন ভেবে, অন্যের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়ে প্রীতি, ভালোবাসা, সেবা ও কল্যাণের মাধ্যমে যে অন্যের মঙ্গলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে সেই প্রকৃত সুখী।
বস্তুত মানুষ সামাজিক জীব। পারস্পরিক ত্যাগের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে মানবসমাজ। এ সমাজে প্রতিটি মানুষ একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। তাই অন্যকে বাদ দিয়ে এ সমাজে একলা বাঁচার কথা কেউ ভাবতে পারে না, সুখী হওয়া তো দূরের কথা।
প্রায় একশ বছর আগে এদেশে যে কজন মহিলা সাহিত্যচর্চা করে গেছেন তাঁদের একজন হলেন কবি কামিনী রায়। একসময় তিনি 'জনৈক বঙ্গমহিলা' ছদ্মনামে লিখতেন। তাঁর কবিতা সহজ, সরল, মানবিক ও উপদেশমূলক। তাঁর কবিতায় জীবনের মহৎ আদর্শের প্রতি গভীর অনুরাগের পরিচয় আছে। মাত্র পনেরো বছর বয়সে তিনি 'আলো ও ছায়া' নামে একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। 'সুখ' কবিতাটি ঐ কাব্যগ্রন্থেরই অন্তর্ভুক্ত।
তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে: 'নির্মাল্য', 'অশোক সংগীত', 'দীপ ও ধূপ' ও 'জীবনপথে'। কবিতা ছাড়াও কামিনী রায় গল্প, নাটক ও জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছেন। সাহিত্যসাধনার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'জগত্তারিণী পদকে' সম্মানিত হন।
কামিনী রায়ের জন্ম ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বাকেরগঞ্জ (বর্তমান বরিশাল) জেলার বাসন্ডা গ্রামে এবং মৃত্যু কলকাতায় ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে।
১. কে, কী করে সুখী হয়-এ বিষয়ে তোমার সহপাঠীদের মতামত নিয়ে একটি প্রবন্ধ রচনা কর। প্রবন্ধে প্রত্যেকের মতামত হুবহু উদ্ধৃত করার চেষ্টা করবে।
২. সুখ বিষয়ে ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ লিখে একটি বিষয়ভিত্তিক দেয়াল পত্রিকা তৈরি কর (শ্রেণির সকল শিক্ষার্থীর কাজ)।
মানুষ জাতি
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে
সে জাতির নাম মানুষ জাতি;
এক পৃথিবীর স্তন্যে লালিত
একই রবি শশী মোদের সাথি।
শীতাতপ ক্ষুধা তৃষ্ণার জ্বালা
সবাই আমরা সমান বুঝি,
কচি কাঁচাগুলি ভাঁটো করে তুলি
বাঁচিবার তরে সমান যুঝি।
দোসর খুঁজি ও বাসর বাঁধি গো,
জলে ডুবি, বাঁচি পাইলে ডাঙা,
কালো আর ধলো বাহিরে কেবল
ভিতরে সবারই সমান রাঙা।
বাহিরের ছোপ আঁচড়ে সে লোপ
ভিতরের রং পলকে ফোটে,
বামুন, শূদ্র, বৃহৎ, ক্ষুদ্র
কৃত্রিম ভেদ ধূলায় লোটে।
বংশে বংশে নাহিকো তফাত
বনেদি কে আর গর-বনেদি,
দুনিয়ার সাথে গাঁথা বুনিয়াদ
দুনিয়া সবারি জনম-বেদি।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
সুমি, দিপ্তী ও ম্যারিথা তিন বন্ধু। প্রত্যেকে প্রত্যেকেরই ধর্মীয় দিনে একে অপরে বাড়িতে বেড়াতে যায়।
এক পৃথিবীর স্তন্যে লালিত - একই মায়ের দুধ পান করে যেমন সন্তান-সন্ততি বেড়ে ওঠে, তেমনি পৃথিবীর সব জাতি-ধর্ম-গোত্রের মানুষ একই পৃথিবীর খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করে জীবন-যাপন করে।
রবি শশী - সূর্য ও চাঁদ।
শীতাতপ (শীত + আতপ) - ঠান্ডা ও গরম।
ক্ষুধা তৃষ্ণার জ্বালা - ক্ষুধা ও পিপাসার কষ্ট।
কচি কাঁচাগুলি ভাঁটো করে তুলি - ছোটদের পরিপুষ্ট করে তুলি।
যুঝি - যুদ্ধ করি। লড়াই করি। সংগ্রাম করি।
তরে - জন্য (সাধারণত পদ্যে এ শব্দ ব্যবহৃত হয়)।
ডাঁটো - পুষ্ট। শক্ত। সমর্থ।
বাঁচিবার তরে সমান যুঝি - মানবিক জীবন-যাপনের জন্য সব মানুষই লড়াই করে।
বাসর বাঁধি গো - সম্প্রীতি গড়ে তুলি।
দোসর - সাথি। বন্ধু। সঙ্গী।
ধলো - সাদা। ফরসা। শুভ্র।
জলে ডুবি, বাঁচি পাইলে ডাঙা - জীবনসংগ্রামে কখনো বিপদে পড়ি আবার সংকট পেরিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখি।
ডাঙা - স্থল। উঁচুভূমি। চর।
জনম-বেদি - সূতিকাগৃহ। জন্মস্থান।
ছোপ - রঙের পোঁচ। ছাপ/দাগ।
বাহিরের ছোপ আঁচড়ে সে লোপ - মানুষের বাইরের চেহারার রং যাই হোক না কেন, আঁচড় লাগলে বা কেটে গেলে যে লাল রক্ত বের হয় তা বাইরের রঙের পার্থক্যকে ঘুচিয়ে দেয়।
শূদ্র - হিন্দু চতুর্বর্ণের (চার বর্ণের) একটি হলো শূদ্র।
বনেদি - প্রাচীন। সম্ভ্রান্ত।
গর-বনেদি - অভিজাত নয় এমন। তুলনীয়: গরহাজির।
বুনিয়াদ - ভিত্তি
দুনিয়া সবারি জনম-বেদি - এ পৃথিবী সব মানুষেরই জন্মক্ষেত্র।
ব্রহ্ম - হিন্দু ধর্মমতে পরমেশ্বর বা বিধাতা।
জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতা ও সমমর্যাদার মনোভাব সৃষ্টি।
মানুষ জাতি কবিতাটি কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের 'অভ্র আবীর' কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। মূল কবিতার নাম 'জাতির পাঁতি'।
দেশে দেশে, ধর্মে ও বর্ণের পার্থক্য সৃষ্টি করে মানুষে মানুষে যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করা হয়েছে, কবি মানুষকে তার চেয়ে উপরে আসন দিয়েছেন।
আমাদের এই পৃথিবী জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষেরই বাসভূমি। এই ধরণীর স্নেহ-ছায়ায় এবং একই সূর্য ও চাঁদের আলোতে লালিত ও প্রতিপালিত হচ্ছে সব মানুষ। শীতলতা ও উষ্ণতা, ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অনুভূতি সব মানুষেরই সমান। বাইরের চেহারায় মানুষের মধ্যে সাদা-কালোর ব্যবধান থাকলেও সব মানুষের ভেতরের রং এক ও অভিন্ন। সবার শরীরে প্রবাহিত হচ্ছে একই লাল রক্ত।
মানুষ আজ জাতিভেদ, গোত্রভেদ, বর্ণভেদ ও বংশকৌলীন্য ইত্যাদি কৃত্রিম পরিচয়ে নিজেদের পরিচয়কে সংকীর্ণ ও গণ্ডিবদ্ধ করেছে। কিন্তু গোটা দুনিয়ার সঙ্গে মানুষের যে জন্মসম্পর্ক, সেই বিচারে মানুষের আসল পরিচয় হচ্ছে সে মানুষ এবং তাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকবার কথা নয়। সারা পৃথিবীতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র-পরিচয়ের ঊর্ধ্বে যে সমগ্র মানবসমাজ, কবি এই কবিতায় মানুষের সে পরিচয়কেই তুলে ধরেছেন। পৃথিবীর সব মানুষকে নিয়েই গড়ে উঠেছে মানুষ জাতি।
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার কাছাকাছি নিমতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু ঘটে। বৈচিত্র্যপূর্ণ ছন্দের কবিতা লিখে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত 'ছন্দের জাদুকর' হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত কর্মজীবন শুরু করেছিলেন ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ করে। কিন্তু পরে ব্যবসায় ছেড়ে সাহিত্যসাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি আরবি, ফারসি, ইংরেজিসহ অনেক ভাষা জানতেন। বিদেশি ভাষা থেকে উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ অনুবাদ করলেও কবি হিসেবেই তিনি অধিক পরিচিত। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: 'বেণু ও বীণা', 'কুহু ও কেকা', 'বিদায় আরতি' ইত্যাদি।
১. মানুষে মানুষে কী ধরনের ভেদাভেদ তোমার চোখে পড়েছে? তোমার দেখা মানুষজনের আলোকে উক্ত ভেদাভেদের বর্ণনা দাও এবং এই ভেদাভেদ কীভাবে কমিয়ে আনা যায় সে ব্যাপারে তোমার মতামত উপস্থাপন কর।
ঝিঙে ফুল
কাজী নজরুল ইসলাম
ঝিঙে ফুল! ঝিঙে ফুল!
সবুজ পাতার দেশে ফিরোজিয়া ফিঙে-কুল- ঝিঙে ফুল।
গুলে পর্ণে
লতিকার কর্ণে
ঢলঢল স্বর্ণে
ঝলমল দোলো দুল- ঝিঙে ফুল ॥
পাতার দেশের পাখি বাঁধা হিয়া বোঁটাতে, গান তব শুনি সাঁঝে তব ফুটে ওঠাতে।
পউষের বেলাশেষ
পরি জাফরানি বেশ
মরা মাচানের দেশ
করে তোলো মঞ্জুল- ঝিঙে ফুল ॥
শ্যামলী মায়ের কোলে সোনামুখ খুকু রে, আলুথালু ঘুমু যাও রোদে গলা দুপুরে।
প্রজাপতি ডেকে যায়-
‘বোঁটা ছিঁড়ে চলে আয়!’
আসমানে তারা চায়-
‘চলে আয় এ অকূল!’ ঝিঙে ফুল ॥
তুমি বলো-'আমি হায়
ভালোবাসি মাটি-মা'য়,
চাই না ও অলকায়-
ভালো এই পথ-ভুল!' ঝিঙে ফুল ॥
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
তাল গাছ এক পায়ে দাড়িয়ে, সবগাছ ছাড়িয়ে
উঁকি মারে আকাশে
মনে হয় কালোমেঘ ফুড়ে যায়, একেবারে উড়ে যায়
কোথা পাবে পাখা সে?
ঝিঙে ফুল - ঝিঙে সবজির ফুল।
ফিরোজিয়া - ফিরোজা রঙের।
গুলে পর্ণে - ঝোপঝাড়ে ও পাতায়।
লতিকার কর্ণে - লতার কানে।
হিয়া - হৃদয়।
সাঁঝে - সন্ধ্যায়।
পউষের - পৌষ মাসের।
পরি - পরিধান করে।
জাফরানি - জাফরান রঙের।
মাচান - মাচা। পাটাতন।
আলুথালু - এলোমেলো।
মশগুল - বিভোর। মগ্ন।
অকূল - কূল বা তীর বিহীন। সীমাহীন।
অলকা - স্বর্গের নাম। হিন্দু ধর্মের ধন-দৌলতের দেবতা কুবেরের আবাসস্থল।
কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও প্রকৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ ছিল গভীর। 'ঝিঙে ফুল' কবিতায় কবির এই প্রকৃতিপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়। আমাদের অতি পরিচিত ঝিঙে ফুলকে উদ্দেশ্য করে তিনি এ কবিতাটি লিখেছেন। পৌষের বেলাশেষে সবুজ পাতার এ দেশে জাফরান রং নিয়ে ঝিঙে ফুল মাচার উপর ফুটে আছে। তাকে বোঁটা ছিঁড়ে চলে আসার জন্য প্রজাপতি ডাকছে। আকাশে চলে যাওয়ার জন্য তারা ডাকলেও ঝিঙে ফুল মাটিকে ভালোবেসে মাটি-মায়ের কাছেই থাকবে। এ কবিতায় প্রকৃতির প্রতি কবির ভালোবাসা একটি ঝিঙে ফুলকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহের কবি, প্রেমের কবি, মানবতার কবি। অন্যায়, শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে উদ্দীপনামূলক কবিতা লিখে বাংলার জনমনে তিনি 'বিদ্রোহী কবি' হিসেবে নন্দিত আসন পেয়েছেন।
বহুবিচিত্র ও বিস্ময়কর তাঁর জীবন। ছেলেবেলায় লেটোর দলে গান করেছেন, বুটির দোকানের কারিগর হয়েছেন, যুদ্ধে যোগ দিয়ে সেনাবাহিনীর হাবিলদার হয়েছেন। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে কারাবরণ করেছেন, পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন।
বিস্ময়কর তাঁর সৃষ্টি। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, সংগীত ইত্যাদি রচনার মাধ্যমে যে জগৎ তিনি তৈরি করেছেন তা অভিনব। তিনি যে শুধু বড়োদের জন্য অনেক গ্রন্থ লিখেছেন তা নয়, ছোটদের জন্যও তিনি লিখেছেন অনেক কাব্য, গান, নাটক ও গল্প। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে: 'ঝিঙেফুল', 'পিলে পটকা', 'ঘুমজাগানো পাখি', 'ঘুমপাড়ানী মাসিপিসি' এবং নাটক হচ্ছে 'পুতুলের বিয়ে'।নজরুলের কবিতা ও গান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তাঁর লেখা গান 'চল্ চল্ চল্' আমাদের রণসংগীত। তিনি আমাদের জাতীয় কবি।
নজরুলের জন্ম ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে আগস্ট তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
১. ১৫টি ফুলের নাম লেখ। ফুলের রং, আকৃতি, পাপড়ি, গন্ধ ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য দাও।
আসমানি
জসীমউদ্দীন
আসমানিরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা- ভেন্না পাতার ছানি
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।
একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,
তারি তলে আসমানিরা থাকে বছর ভরে।
পেটটি ভরে পায় না খেতে, বুকের ক'খান হাড়,
সাক্ষী দেছে অনাহারে কদিন গেছে তার।
মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপ-রাশি,
থাপড়েতে নিবিয়ে গেছে দারুণ অভাব আসি।
পরনে তার শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস,
সোনালি তার গার বরনের করছে উপহাস।
ভোমর-কালো চোখ দুটিতে নাই কৌতুক-হাসি,
সেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু রাশি রাশি।
বাঁশির মতো সুরটি গলায় ক্ষয় হল তাই কেঁদে,
হয়নি সুযোগ লয় যে সে-সুর গানের সুরে বেঁধে।
আসমানিদের বাড়ির ধারে পদ্ম-পুকুর ভরে,
ব্যাঙের ছানা শ্যাওলা-পানা কিল-বিল-বিল করে।
ম্যালেরিয়ার মশক সেথা বিষ গুলিছে জলে
সেই জলেতে রান্না খাওয়া আসমানিদের চলে।
পেটটি তাহার ফুলছে পিলেয়, নিতুই যে জ্বর তার,
বৈদ্য ডেকে ওষুধ করে পয়সা নাহি আর।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
সায়নী তার বাবা মার সাথে এক বস্তিতে থাকে। তাদের দুবেলা দুটো ভাত ঠিকমতো জোটে না, বৃষ্টি হলে ঘরে পানি পড়ে। পাশের জলাশয়ের নোংরা, জীবাণুযুক্ত জলেই তাদের রান্নাবান্না চলে।
ভেন্না পাতা - ভেন্না এক ধরনের গাছ। গরিব মানুষ এ গাছের পাতা ঘরের ছাউনি হিসেবে ব্যবহার করে।
সাক্ষী - কোনো ঘটনা যে সামনে থেকে দেখে এবং দরকারি জায়গায় প্রকাশ করে। প্রত্যক্ষদর্শী।
দেছে - 'দিয়েছে' শব্দের আঞ্চলিক রূপ।
অনাহারে - আহার বা খাবার-ছাড়া। না খেয়ে বা অভুক্ত থাকা।
হাসির প্রদীপ-রাশি - প্রদীপ যেমন আলো ছড়ায়, তেমনি হাসি মুখমণ্ডলকে উজ্জ্বল করে। আনন্দময় অনুভূতি প্রকাশ করে।
বাস - পোশাক। জামা।
গার - গায়ের। শরীরের।
বরনের - রঙের।
উপহাস - ঠাট্টা।
মশক - মশা।
পিলে - প্লীহা। Spleen। পাকস্থলীর বাম পাশের একটি অংগ। এ অংগের অসুখ হলে পেট ফুলে ওঠে।
নিতুই - নিত্য বা প্রতিদিন। রোজ। এটি একটি কাব্যিক পদ।
বৈদ্য - কবিরাজ। গ্রাম্য চিকিৎসক।
'আসমানি' কবিতায় সাধারণ মানুষের প্রতি, বিশেষত গ্রামের শিশুদের দুঃখ-কষ্টময় জীবনের প্রতি মমতাময় অনুভূতির নান্দনিক প্রকাশ ঘটেছে।
আসমানি গরিব, তাদের বাসা পাখির বাসার মতো হালকা। একটু বৃষ্টিতেও তাদের বাসা নড়বড় করে। ঠিক মতো খেতে পায় না বলে অসুখে ভোগে। পোশাক তার ছেঁড়া। মুখে তার হাসি নেই, কণ্ঠে নেই গান। তাদের বাড়ির আশপাশ অস্বাস্থ্যকর। আসমানির জীবনে আনন্দ নেই।
অনেক দরদ দিয়ে কবি আসমানির জীবনের যে চিত্র এঁকেছেন, তা আমাদের সহানুভূতি এবং সামাজিক দায়বোধ জাগিয়ে তোলে।
জসীমউদ্দীন ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর কবিতা রচনা শুরু। তিনি যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখনই তাঁর 'কবর' কবিতা প্রবেশিকা শ্রেণির বাংলা সংকলনে স্থান পায়। তাঁর কবিতায় গ্রামবাংলার জীবন ও প্রকৃতির ছবি ফুটে উঠেছে সহজ- সরল ভাষা ও সাবলীল ছন্দে।
জসীমউদ্দীনের প্রধান কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে 'নক্সী কাঁথার মাঠ', 'সোজন বাদিয়ার ঘাট', 'রাখালী', 'বালুচর', 'ধানখেত' 'সুচয়নী' ইত্যাদি। এ ছাড়া তিনি ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, নাটক, সঙ্গীত ও প্রবন্ধের বই রচনা করেছেন। শিশুদের জন্য লেখা 'ডালিম কুমার' তাঁর অনবদ্য রচনা। জসীমউদ্দীনের কর্মজীবন শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার মাধ্যমে, পরে তিনি দীর্ঘ দিন কাজ করেন সরকারের প্রচার বিভাগে। ১৯৭৬ সালে তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
১। ছুটিতে গ্রামে গিয়ে কবিতায় বর্ণিত জীবনের সঙ্গে মেলে এমন পরিবারের ঘরদোর, পোশাক, খাবার ইত্যাদির একটি তালিকা প্রস্তুত কর।
২। উক্ত তালিকার ভিত্তিতে গরিব মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বর্ণনা দাও।
চিঠি বিলি
রোকনুজ্জামান খান
ছাতা মাথায় ব্যাঙ চলেছে
চিঠি বিলি করতে
টাপুস টুপুস ঝরছে দেয়া
ছুটছে খেয়া ধরতে।
খেয়ানায়ের মাঝি হলো
চিংড়ি মাছের বাচ্চা,
দু চোখ বুজে হাল ধরে সে
জবর মাঝি সাচ্চা।
তার চিঠিও এসেছে আজ
লিখছে বিলের খলসে,
সাঁঝের বেলার রোদে নাকি
চোখ গেছে তার ঝলসে।
নদীর ওপার গিয়ে ব্যাঙা
শুধায় সবায়: ভাইরে,
ভেটকি মাছের নাতনি নাকি
গেছে দেশের বাইরে?
তার যে চিঠি এসেছে আজ
লিখছে বিলের কাতলা:
এবার সারা দেশটি জুড়ে
নামবে দারুণ বাদলা।
তাই তো নিলাম ছাতা কিনে
আসুক এবার বর্ষা,
চিংড়ি মাঝির খেয়া না আর
ছাতাই আমার ভরসা।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
আমি যে গহীন গাঙের নাইয়া।
সাঁঝের বেলায় নাও বাইয়া যাই,
আপন মনে চাইয়া।।
জোনাক জ্বালায় আপন বাতি গান ধরেছে পুষি
হুতুমপেঁচা মন্ত্র পড়ে দেখে সবাই খুশি।
উদবিড়ালীর মাছ আনতে হলো বেজায় দেরি
ইলিশ' এবং ভেটকি দেখে হর্ষ বিড়ালেরই।
কাতলা - মাছের নাম।
খলসে - মাছের নাম।
খেয়া - নদী পার হওয়ার নৌকা।
খেয়া না - খেয়া নৌকা।
খেয়ানায়ের মাঝি - খেয়া নৌকার মাঝি।
চিঠি - পত্র; খবর বা কুশলাদি জানিয়ে কাউকে লেখা।
চিঠি বিলি করা - চিঠি পৌঁছে দেওয়া।
ঝলসানো - উজ্জ্বল আলোয় চোখ ধাঁধানো।
টাপুস টুপুস - বৃষ্টি পড়ার শব্দ।
দেয়া - মেঘ।
বাদলা - একনাগাড়ে বৃষ্টি।
ভরসা - নির্ভর করা, অবলম্বন।
ভেটকি - মাছের নাম।
সাঁঝের বেলা - সন্ধ্যার সময়।
সাচ্চা - সত্য ।
রোকনুজ্জামান খানের 'হাট্ টিমা টিম' বই থেকে ছড়াটি সংকলন করা হয়েছে। এ ছড়ায় ছন্দে ছন্দে মজার একটি গল্প পরিবেশিত হয়েছে। এখানে দেখা যাচ্ছে, চিঠি বিলি করার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছে একটি ব্যাঙ। কিন্তু বাইরে টাপুস টুপুস করে বৃষ্টি ঝরছে। ব্যাঙটিকে খেয়া নৌকায় নদী পাড়ি দিতে হবে। নৌকার মাঝি হিসেবে কাজ করছে চিংড়ি মাছের বাচ্চা। তাকে চিঠি লিখেছে বিলের খলসে মাছ। খলসে লিখেছে, সন্ধ্যাবেলার রোদে তার চোখ ঝলসে গিয়েছে। ওদিকে ভেটকি মাছের নাতনির কাছে চিঠি লিখেছে বিলের কাতলা মাছ। চিঠিতে কাতলা জানিয়েছে, সারা দেশ জুড়ে এ বছর খুব বৃষ্টি হবে। এই ভয়ে ব্যাঙ একটি ছাতা কিনে নিয়েছে। কারণ চিংড়ি মাঝির খেয়া নৌকার ওপর ব্যাঙের কোনো ভরসা নেই। ছড়াটির মাধ্যমে রোকনুজ্জামান খান আমাদের কল্পনাকে নিয়ে যান জলজ প্রাণীদের জগতে। সেখানে আমরা অদ্ভুত সব ঘটনার মুখোমুখি হই। ব্যাঙের চিঠি বিলি করা, ছাতা কেনা, চিংড়ি মাছের নৌকার মাঝি হওয়া কিংবা মাছেদের চিঠি লেখা বাস্তবে অসম্ভব ঘটনা। কিন্তু সব ঘটনাকেই আমরা কল্পনা করে নিতে পারি। কেননা মানুষের কল্পনা অসীম। ছড়া, কবিতা ও গল্পের মাধ্যমে কবি-লেখকেরা মানুষের জীবনছবি আঁকার পাশাপাশি মানুষের অদ্ভুত ও অসম্ভব কল্পনাকেও আঁকতে পারেন।
রোকনুজ্জামান খান ১৯২৫ সালে রাজবাড়ি জেলার পাংশায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন শিশু সাহিত্যিক। সাংবাদিক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। 'দাদাভাই' ছদ্মনামে তিনি পত্রিকায় শিশুদের জন্য বিশেষ পাতা সম্পাদনা করতেন। এ নামেই রোকনুজ্জামান খান বিশেষভাবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য শিশুতোষ বই 'হাট্ টিমা টিম' (১৯৬২), 'খোকন খোকন ডাক পাড়ি'। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকার নাম 'কচি ও কাঁচা'। রোকনুজ্জামান খান 'কচি-কাঁচার মেলা' নামে একটি শিশু-কিশোর সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯৯৯ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
১. এ কবিতায় যেসব প্রাকৃতিক উপাদানের নাম আছে, তার প্রতিটির এক বাক্যের পরিচয়সহ তালিকা প্রস্তুত করো (দলগত কাজ)।
২. কোনো মজার ঘটনা বর্ণনা করে বন্ধুকে চিঠি লেখো (একক কাজ)।
বাঁচতে দাও
শামসুর রাহমান
এই তো দ্যাখো ফুলবাগানে গোলাপ ফোটে,
ফুটতে দাও।
রঙিন কাটা ঘুড়ির পিছে বালক ছোটে,
ছুটতে দাও।
নীল আকাশের সোনালি চিল মেলছে পাখা,
মেলতে দাও।
জোনাক পোকা আলোর খেলা খেলছে রোজই,
খেলতে দাও।
মধ্য দিনে নরম ছায়ায় ডাকছে ঘুঘু,
ডাকতে দাও।
বালির ওপর কত্ত কিছু আঁকছে শিশু,
আঁকতে দাও।
কাজল বিলে পানকৌড়ি নাইছে সুখে,
নাইতে দাও।
গহিন গাঙে সুজন মাঝি বাইছে নাও,
বাইতে দাও।
নরম রোদে শ্যামা পাখি নাচ জুড়েছে,
নাচতে দাও।
শিশু, পাখি, ফুলের কুঁড়ি-সবাইকে আজ
বাঁচতে দাও।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
রঙিন কাটা ঘুড়ি জোনাক পোকা আলোর খেলা - ঘুড়ি উড়িয়ে কাটাকাটির লড়াইয়ে সুতো কেটে যাওয়া রঙিন ঘুড়ি।
খেলছে রোজই - সন্ধ্যার অন্ধকারে জোনাকিরা আলো জ্বালিয়ে যেন খেলায় মাতে।
সবাইকে আজ বাঁচতে দাও - প্রকৃতি কেবল মানুষের বসবাসের জায়গা নয়-গাছপালা, পশুপাখি সকলেরই আছে বাঁচার সমান অধিকার। তা না হলে মানুষের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়বে।
পানকৌড়ি - কালো রঙের হাঁস জাতীয় মাছ-শিকারি পাখি।
নাইতে - গোসল করতে। স্নান করতে।
গহিন - গভীর। অতল। গহন।
গাঙে - নদীতে।
প্রকৃতি ও পরিবেশ মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান আশ্রয়। মানুষ ও প্রকৃতি পরিবেশের অংশ। অথচ মানুষের হাতেই দিন দিন এগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ফলে বিপন্ন হচ্ছে মানুষ ও প্রাণীদের জীবন। আমাদের চারপাশ যদি সজীব ও সুন্দর না হয় তাহলে বেঁচে থাকার আনন্দই বৃথা হয়ে যাবে।
কবি শামসুর রাহমান 'বাঁচতে দাও' কবিতায় প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রাণিজগতের সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশের কথা বলেছেন। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে তার চারপাশের সুস্থ পরিবেশের সম্পর্ক রয়েছে। যদি পৃথিবীতে ফুল না থাকে, পাখি না থাকে, সবুজ ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। কবিতায় এইসব প্রতিকূলতাকে জয় করার কথাই সুন্দর করে তুলে ধরা হয়েছে।
শামসুর রাহমানের কবিতায় নাগরিক জীবন, মুক্তিযুদ্ধ, গণ-আন্দোলন নানা অনুভূতিতে রূপায়িত হয়েছে। তাঁর কবিতা তাই দেশপ্রেম ও সমাজ সচেতনতায় সতেজ ও দীপ্ত। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি।
শামসুর রাহমান পেশায় সাংবাদিক। বিভিন্ন সময়ে তিনি 'মর্নিং নিউজ', 'রেডিও বাংলাদেশ', 'দৈনিক গণশক্তি' ইত্যাদিতে সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রায় এক দশক ধরে তিনি ছিলেন 'দৈনিক বাংলা'র সম্পাদক। কবিতা অনুবাদেও তিনি সিদ্ধহস্ত। এছাড়া তিনি উপন্যাস, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা লিখেছেন।
শিশুদের জন্যও শামসুর রাহমান চমৎকার কবিতা লিখেছেন। 'এলাটিং বেলাটিং', 'ধান ভানলে কুঁড়ো দেবো', 'গোলাপ ফোটে খুকীর হাতে' ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য ছড়া কবিতার বই।
সাহিত্য-সাধনার স্বীকৃতি হিসেবে কবি শামসুর রাহমান অনেক পুরস্কার ও পদকে ভূষিত হয়েছেন। এসব পুরস্কারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক ও মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক।
শামসুর রাহমানের জন্ম ঢাকায় ১৯২৯ সালে। তাঁর পৈতৃক নিবাস নরসিংদী জেলার পাড়াতলী গ্রামে। তিনি ২০০৬ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ, চলো আমরা মজা করে কবিতাটি আবৃত্তি করি। এ জন্য প্রথমেই আমাদের উপস্থিত বন্ধুদের দুই দলে ভাগ করে নিতে হবে। 'ক' দলের বন্ধুরা কবিতার একটি অংশ সমবেতভাবে আবৃত্তি করবে, সাথে সাথে 'খ' দলের বন্ধুরা পরের নির্ধারিত অংশ আবৃত্তি করবে। এ নিয়মটি আমরা পরের বার উল্টে দিতে পারি। তাহলে চলো বৃন্দ-আবৃত্তিটি করি।
ক-দল
এই তো দ্যাখো ফুল বাগানে গোলাপ ফোটে
রঙিন কাটা ঘুড়ির পিছে বালক ছোটে
নীল আকাশের সোনালি চিল মেলছে পাখা
জোনাক পোকা আলোর খেলা খেলছে রোজই
মধ্যদিনে নরম ছায়ায় ডাকছে ঘুঘু
বালির ওপর কত্ত কিছু আঁকছে শিশু
কাজল বিলে পানকৌড়ি নাইছে সুখে
গহিন গাঙে সুজন মাঝি বাইছে নাও
নরম রোদে শ্যামা পাখি নাচ জুড়েছে
শিশু, পাখি, ফুলের কুঁড়ি- সবাইকে আজ
খ-দল
ফুটতে দাও
ছুটতে দাও
মেলতে দাও
খেলতে দাও
ডাকতে দাও
আঁকতে দাও
নাইতে দাও
বাইতে দাও
নাচতে দাও
বাঁচতে দাও
এবার চলো যে কোনো একজন কবিতাটির ভাবার্থ পাঠ করে শোনাই। লক্ষ করো, কবিতাটির আবৃত্তি ও পাঠের মধ্যে কী কী পার্থক্য রয়েছে। এবার নিচের ছকে পাঠ ও আবৃত্তির মধ্যে পার্থক্যগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করো (প্রথমটি করে দেয়া আছে)।
| আবৃত্তির বৈশিষ্ট্য | পাঠের বৈশিষ্ট্য |
১ | আবৃত্তি কবিতা বা ছড়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য | পাঠ সাধারণত গদ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য |
২ |
|
|
৩ |
|
|
৪ |
|
|
৫ |
|
|
পাখির কাছে ফুলের কাছে
আল মাহমুদ
নারকেলের ঐ লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল
ডাবের মতো চাঁদ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল।
ছিটকিনিটা আস্তে খুলে পেরিয়ে গেলাম ঘর
ঝিমধরা এই মস্ত শহর কাঁপছিলো থরথর।
মিনারটাকে দেখছি যেন দাঁড়িয়ে আছেন কেউ,
পাথরঘাটার গির্জেটা কি লাল পাথরের ঢেউ?
দরগাতলা পার হয়ে যেই মোড় ফিরেছি বাঁয়
কোথেকে এক উটকো পাহাড় ডাক দিলো আয় আয়।
পাহাড়টাকে হাত বুলিয়ে লালদিঘির ঐ পাড়
এগিয়ে দেখি জোনাকিদের বসেছে দরবার।
আমায় দেখে কলকলিয়ে দিঘির কালো জল
বললো, এসো, আমরা সবাই না-ঘুমানোর দল-
পকেট থেকে খোলো তোমার পদ্য লেখার ভাঁজ
রক্তজবার ঝোঁপের কাছে কাব্য হবে আজ।
দিঘির কথায় উঠল হেসে ফুল পাখিরা সব
কাব্য হবে, কাব্য কবে-জুড়লো কলরব।
কী আর করি পকেট থেকে খুলে ছড়ার বই
পাখির কাছে, ফুলের কাছে মনের কথা কই।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
কলেজের শিক্ষাসফরে রিমি বন্ধুদের সঙ্গে বান্দরবানে বেড়াতে এসেছে। বান্দরবানের বড় বড় পাহাড় ও প্রকৃতির সৌন্দর্য রিমিকে বিমোহিত করে। প্রকৃতির এ নিসর্গের মাঝে রিমির হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।
গোলগাল - জ্যোৎস্নামাখা পূর্ণিমায় গোল চাঁদকে ডাবের মতো কল্পনা করে কবি তুলনার চমৎকারিত্ব সৃষ্টি করেছেন।
থরথর - কেঁপে ওঠার ভাব বোঝায় এমন শব্দ। এখানে শব্দটি সৌন্দর্য ও আবেগ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
মিনার - মসজিদের উঁচু স্তম্ভ। গম্বুজযুক্ত দালান।
গির্জে - খ্রিষ্টানদের উপাসনালয়।
উটকো - অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রত্যাশিত। এখানে মমত্বের অনুভূতি বোঝাতে উটকো শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
দরবার - রাজসভা। জলসা। এখানে আনন্দ-আসর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
কলকলিয়ে - কলকল ধ্বনি করে।
পদ্য লেখার ভাঁজ - ভাঁজ করে রাখা কবিতা লেখা কাগজ।
কলরব - কোলাহল।
'পাখির কাছে ফুলের কাছে' শীর্ষক কবিতাটি আল মাহমুদের 'পাখির কাছে ফুলের কাছে' নামক কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। এই কবিতায় কবির নিসর্গপ্রেম গভীর মমত্বের সঙ্গে ফুটে উঠেছে।
এই কবিতায় কবি প্রকৃতির বিচিত্র সৌন্দর্যের কাছে যেতে চান, তাদের সঙ্গে মিশে যেতে চান। প্রকৃতি যেন মানুষের পরম আত্মীয়, সখা। কবি মনোরম সেই প্রকৃতির আহ্বান শুনতে পান। জড় প্রকৃতি আর জীব- প্রকৃতির মধ্যে যে নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান কবি সেই সম্পর্কের সৌন্দর্য ও আনন্দ অনুভব করেন। আর তাঁর ছড়া-কবিতার খাতা ভরে ওঠে প্রকৃতির সেই সৌন্দর্য ও আনন্দের পঙ্ক্তিমালায়।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জর্জ সিক্সথ স্কুল থেকে তিনি প্রবেশিকা পাস করেন। সাংবাদিকতা ও চাকরি ছিল তাঁর পেশা। তিনি 'গণকণ্ঠ' ও 'কর্ণফুলী' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। মাঝের দীর্ঘ সময় তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে চাকরি করেন এবং পরিচালক হিসেবে ১৯৯৫ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বই হলো- 'লোক-লোকান্তর', 'কালের কলস', 'সোনালি কাবিন', 'মায়াবী পর্দা দুলে উঠো', 'মিথ্যাবাদী রাখাল', 'একচক্ষু হরিণ', 'আরব্য রজনীর রাজহাঁস', 'পাখির কাছে ফুলের কাছে' ইত্যাদি।
সাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও একুশে পদকসহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি ২০১৯ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
১. কবিতাটির বিভিন্ন অংশ অবলম্বনে একাধিক ছবি আঁক।
২. প্রকৃতি নিয়ে (ফুল-পাখি-লতা-পাতা, নদ-নদী) ছড়া-কবিতা লিখতে চেষ্টা কর। তোমার প্রিয় কোনো কবিকে অনুসরণ করেও লিখতে পার।
ফাগুন মাস
হুমায়ুন আজাদ
ফাগুনটা খুব ভীষণ দস্যি মাস
পাথর ঠেলে মাথা উঁচোয় ঘাস।
হাড়ের মতো শক্ত ডাল ফেঁড়ে
সবুজ পাতা আবার ওঠে বেড়ে।
সকল দিকে বনের বিশাল গাল
ঝিলিক দিয়ে প্রত্যহ হয় লাল।
বাংলাদেশের মাঠে বনের তলে
ফাগুন মাসে সবুজ আগুন জ্বলে।
ফাগুনটা খুব ভীষণ দুঃখী মাস
হাওয়ায় হাওয়ায় ছড়ায় দীর্ঘশ্বাস
ফাগুন মাসে গোলাপ কাঁদে বনে
কান্নারা সব ডুকরে ওঠে মনে।
ফাগুন মাসে মায়ের চোখে জল
ঘাসের ওপর কাঁপে যে টলমল।
ফাগুন মাসে বোনেরা ওঠে কেঁদে
হারানো ভাই দুই বাহুতে বেঁধে।
ফাগুন মাসে ভাইয়েরা নামে পথে
ফাগুন মাসে দস্যু আসে রথে।
ফাগুন মাসে বুকের ক্রোধ ঢেলে
ফাগুন তার আগুন দেয় জ্বেলে।
বাংলাদেশের শহর গ্রামে চরে
ফাগুন মাসে রক্ত ঝরে পড়ে।
ফাগুন মাসে দুঃখী গোলাপ ফোটে
বুকের ভেতর শহিদ মিনার ওঠে।
সেই যে কবে কয়েকজন খোকা
ফুল ফোটালো-রক্ত থোকা থোকা-
গাছের ডালে পথের বুকে ঘরে
ফাগুন মাসে তাদেরই মনে পড়ে।
সেই যে কবে-তিরিশ বছর হলো-
ফাগুন মাসের দু-চোখ ছলোছলো।
বুকের ভেতর ফাগুন পোষে ভয়-
তার খোকাদের আবার কী যে হয়!
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ফাগুন - ফাল্গুন। বাংলা বছরের একাদশ মাস।
ভীষণ দস্যি মাস - ফাল্গুন মাসকে দুরন্ত মাস হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।
পাথর ঠেলে মাথা উঁচোয় ঘাস - পাথরের বুকেও ঘাস জন্মায়।
ফেঁড়ে - চিরে, বিদীর্ণ করে।
সকল দিকে বনের বিশাল গাল - গাছপালার বিপুলতা বোঝানো হয়েছে।
প্রত্যহ হয় লাল - লাল ফুলের সম্ভারে রঙিন হয়ে ওঠে।
সবুজ আগুন জ্বলে - বনের সবুজ বিস্তারকে কবি সবুজ আগুন বলে কল্পনা করছেন।
ভীষণ দুঃখী মাস - ফাগুন মাস দুঃখের ইতিহাসের স্মৃতি-বিজড়িত। এ মাসেই ভাষা-শহিদেরা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ডুকরে ওঠে - থেমে থেমে জোরে জোরে কান্না উথলে ওঠে।
ফাগুন মাসে মায়ের চোখে জল - এ মাসে শহিদ পুত্রের কথা স্মরণ করে মায়ের চোখে জল আসে।
ফাগুন মাসে ভাইয়েরা নামে পথে - এ মাসে শহিদদের অমর আদর্শে বাংলার দামাল সন্তানেরা বারবার সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে।
ফাগুন মাসে দস্যু আসে রথে - ১৯৫২-র ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনকারীদের নির্মম নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। কবি আক্রমণকারী পাকিস্তানিদের দস্যু বলে অভিহিত করেছেন।
বুকের ক্রোধ ঢেলে - প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ প্রকাশ করে।
ফাগুন মাসে রক্ত ঝরে পড়ে - এ মাসে ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করা হয়েছে।
বুকের ভেতর শহিদ মিনার ওঠে - ফাল্গুন মাসে দেশপ্রেমিক প্রতিটি বাঙালি শহিদ দিবসের চেতনায় আলোড়িত হয়।
বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনের পটভূমিতে মাতৃভাষা ও দেশপ্রেমবোধে উদ্বুদ্ধ করা।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ফাল্গুন মাসের সঙ্গে একুশে ফেব্রুয়ারি একই সূত্রে গাঁথা। কেননা এ মাসেই বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে ঢাকার রাজপথ বাংলার সাহসী সন্তানদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। প্রতি বছর যখন ফাগুন মাস আসে, তখন আমাদের স্মৃতি চলে যায় ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তঝরা দিনে। বসন্ত ঋতুর প্রথম মাস ফাল্গুন। প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্যের পাশাপাশি এই মাস আমাদের মধ্যে দুঃখবোধ জাগিয়ে দেয়। আমাদের পূর্বপুরুষদের আত্মত্যাগের গৌরবে আমরাও একই সঙ্গে দুঃখী এবং সাহসী হয়ে উঠি।
'ফাগুন মাস' কবিতায় তুলে ধরা হয়েছে শোক ও বেদনার গভীর অনুভূতি। আমাদের ফাল্গুন অন্য দেশের ফাল্গুন মাসের মতো নয়। বাংলাদেশের ফাল্গুনে বনের ভেতর জ্বলে সবুজ আগুন, আমরা ভাষার জন্য আত্মদানকারী পূর্বপুরুষদের জন্য অনুভব করি দুঃখ ও মমতা। আবার তাঁদের আত্মত্যাগের শক্তি সাহস জোগায় আমাদের মনে। আমাদের প্রত্যেকের ভেতরেই গোলাপ ফুলের মতো একেকটা শহিদ মিনার জেগে ওঠে। আমরা বাংলার বীর সন্তানদের স্মরণ করি প্রতিটি ফাল্গুনে।
হুমায়ুন আজাদ ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের (বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলা) রাঢ়িখালে জন্মগ্রহণ করেন। একজন কৃতী ছাত্র হিসেবে তিনি তাঁর শিক্ষাজীবন শেষ করেন। কর্মজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একজন গবেষক হিসেবে তিনি খ্যাতি পেয়েছেন। একাধারে তিনি ছিলেন ভাষাবিজ্ঞানী, কবি, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক। তাঁর গবেষণাগ্রন্থ হচ্ছে 'বাক্যতত্ত্ব' এবং কিশোরদের জন্য তাঁর লেখা দুটি গ্রন্থ 'লাল নীল দীপাবলি' ও 'কতো নদী সরোবর'। তিনি ১৯৮৭ সালে সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। হুমায়ুন আজাদ ২০০৪ সালে জার্মানির মিউনিখ শহরে মৃত্যুবরণ করেন।
'ফাগুন মাস' কবিতাটি ভালোভাবে পড়। কবিতাটিতে ফাল্গুন মাসে প্রকৃতির কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে। আর আছে কিছু ঘটনার ইশারা। কবিতাটি পড়ে নিচের দুটি ছকে সে দুটি দিক লিখ।